করোনা আক্রান্ত মাকে সুস্থ করে তবেই বাড়ি ফিরেছেন কৌশিক

মহামারীর এই সময়ে চারদিকে যখন শুধুই খারাপ সংবাদ, তখন সুখবর শোনালেন ডেমরার কৌশিকুর রহমান। পেশায় আলোকচিত্রী কৌশিক মায়ের করোনা সংক্রমণের সময়েও নিরাপদ থেকে মায়ের সেবা করে গেছেন। দশদিন মায়ের সাথে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডেই ছিলেন। অবশেষে মায়ের করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে তবেই ঈদের একদিন আগে বাড়ি ফেরেন। এই সময়ে তার নিজেরও করোনা সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকি ছিল। নিজেকে নিরাপদে রেখেই কীভাবে মায়ের শুশ্রুষা করেছেন সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন তিনি নিজেই।

ডেমরার মেন্দিপুরের বাসিন্দা কামরুন নাহার, ৬ই মে থেকেই হালকা জ্বর আসে। শুরুতে সাধারণ জ্বর ভেবে খুব একটা আমলে নেয়নি কেউই। এরপর দিন থেকে শুরু হয় ক্ষুধামন্দা, সেই সাথে দুর্বলতা আর বমি বমি ভাব। তখনই সন্দেহ হয় করোনা নয় তো? পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শে ঘরে থেকেই ওষুধ খাওয়া শুরু করেন। অসুস্থ বাবাকে তখনই আলাদা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করেন, যদি করোনা হয়েই থাকে তাহলে যেন অন্যজনের কাছে তা না ছড়ায়। এরমধ্যেই বিভিন্নজনের কাছ থেকে খোঁজ নেয়া শুরু করেন কোথায় কীভাবে করোনা পরীক্ষা করা যায়।

পরদিন কৌশিকের স্ত্রী তানজিনা সকালে ৬ টায় যেয়ে হাজির হন পিজি হাসপাতালে, সেই ভোরেই লাইন ৫০০ জনের ছাড়িয়েছে, ২৫০ জনের বেশি পরীক্ষা করবে না তারা। তখন ঢাকা মেডিকেলে ছোটেন , মৃদু শ্বাসকষ্ট দেখে মাকে আউটডোরে টেস্ট করাতে রাজি হননি ঢামেকের চিকিৎসকেরা। ভর্তি হতে বলেছিলেন, কিন্তু করোনা সনাক্তের আগেই ভর্তি হয়ে ঝুঁকি বাড়বে না তো? এমন সংশয়ে ছুটলেন মুগদা আর কুর্মিটোলায়, সেখানেও সেদিন পরীক্ষার সিরিয়াল মেলেনি। অবশেষে পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু ব্লাড টেস্ট আর এক্সরে করে বাড়ি ফেরেন। সেই রিপোর্টেই সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়, নিউমোনিয়ার আশংকা করা হচ্ছিল, যা করোনার বড় উপসর্গ।

সেদিন ১০ মে, এর মধ্যে কেটে গেছে ৩-৪ দিন। মায়ের শ্বাসকষ্ট বেড়ে চলেছে। এক তলা সিঁড়ি বেয়ে ওঠাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শে নিজেরাই অক্সিজেন মাপার জন্য পালস অক্সোমিটার কিনে আনে। বাড়িতেই অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে এনে মাকে অক্সিজেন দিতে শুরু করেন কৌশিক। সেই সাথে চলে অক্সোমিটারে এক ঘণ্টা পরপর পর্যবেক্ষণ। স্ত্রীকে নিয়ে একাই সামলা চলেছেন এসব, আর সুযোগ খুঁজছেন যদি করোনা পরীক্ষা করা যায়।

এরমধ্যে কামরুন নাহারের খাবারের রুচি একেবারেই নাই হয়ে যায়, পাচ্ছিলেন না কোন কিছুর ঘ্রাণ। মায়ের জন্য ভাত মেখে, মাছ বেছে দিতেন , করোনার ঝুঁকি থাকলেও মায়ের কাছে এই সময়ে না যেয়ে কীভাবে পারবেন? যতটুকু দূরত্ব রেখে সম্ভব সে বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। এর মধ্যেই সিটি স্ক্যানসহ আরো কিছু পরীক্ষা করা হয়, অনলাইনে এই রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকেরা দ্রুত এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন শুরুর পরামর্শ দেন। বাসায় রেখে নিয়ম মেনে ইঞ্জেকশন দেয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট না থাকলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াও দুরূহ। অবশেষে কুর্মিটোলা হাসপাতাল অনুরোধে রাজি হয়ে মায়ের পরীক্ষা করে। রাতেই রিপোর্ট আসে করোনা পজেটিভ। জরুরী প্রয়োজনে যদি চিকিৎসকের প্রয়োজন হয় এই ভেবে ১৪ তারিখ দুপুরে মা কে নিয়ে কৌশিক একাই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান। ওয়ার্ডের বাইরে যাবেন না এই শর্তে সেও অনেকটা রোগীর মতই সার্বক্ষণিক থেকে যান ওয়ার্ডে।

হাসপাতালের দশটা দিন মায়ের সাথেই থেকেছেন, অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে পাশেই বসে থেকেছেন, কখন মায়ের কী লাগে! কুর্মিটোলা হাসপাতালের সেবার মানে সন্তুষ্টিও জানান কৌশিক। দিনে নিয়ম করে দুবার ডাক্তাররা আসতেন, পরিষ্কারও করা হত নিয়মিত।

খাবার দাবার নিয়ে মাঝে কিছু গুঞ্জন ছড়ালেও মা কে দুধ ডিম হরলিকসসহ মাছ মুরগি ভাত সবজি যেমনটা দরকার হাসপাতাল থেকেই দিত সঠিক সময়ে। মায়ের সাথে সার্বক্ষণিক থাকায় তার যাবতীয় খাবারের ব্যবস্থাও হাসপাতাল করেছিল। অবশেষে ২৩ তারিখ সন্ধ্যায় কৌশিক ও তার মায়ের পরপর দুদিন রেজাল্ট নেগেটিভ আসায় তাদেরকে কোয়ারেন্টাইনে থাকার শর্তে রিলিজ দেয়া হয়। এই দুই সপ্তাহে কৌশিকের নিজেরো সংক্রমণের ঝুঁকি ছিল শতভাগ।

রীতিমতো করোনার সাগরে মায়ের সাথে কাটাতে হয়েছে এই দশদিন। নিজেকে যতটুকু সম্ভব নিরাপদ রাখার চেষ্টা করতেন। বারবার হাত ধোয়া আর স্যানিটাইজ করার পাশাপাশি মাস্ক রাখতে হত ২৪ ঘণ্টা। যেকোনো কিছু স্পর্শ করার আগেই স্প্রে করে ডিসইনফেক্ট করা, আর অহেতুক চোখে মুখে হাত না দেয়া। কেবল মাকে সুস্থ করার পণ থেকেই নিজের মনোবল শক্ত রাখার চেষ্টা করেছেন। রিলিজ পেয়েও মা ছেলে বাড়িতেই আলাদা ঘরে আছেন, নিজেরাই সেই ৭ তারিখ থেকেই বাড়ি লকডাউন করেছেন। পুলিশ থেকে বারবার তাদের ফোন করে খোঁজও নেয়া হচ্ছে- কোন প্রয়োজন আছে কি না।

মায়ের জন্য ছেলে করবেই- এটাই হয়তো হওয়ার কথা। কিন্তু গেল ক মাসের পরিবর্তিত চিত্রে যে করুণ গল্পগুলো আমরা শুনেছি, তার কাছে কৌশিকের মা কে নিয়ে এই লড়াইটা যারপরনাই বলার মতন। অসুস্থ থেকেও মা হয়তো সন্তানেরই মঙ্গল চেয়ে গেছেন- তাই হয়তো কৌশিক নিজে সুস্থ রেখে মাকে সুস্থ করে বাড়িতে ফিরতে পেরেছেন, এরকম ঈদ আর কখনো আসেনি তাদের পরিবারে!

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *