কুরআন শরীফে চুল : ধুয়ে পানি খেলে করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির গুজব

বর্তমান মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগে গুজব ছড়ানো খুবই সহজ। আজকাল ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ব্লগগুলোয় গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।

কোনো বিষয়ে সঠিকভাবে কিছু জানা না থাকলে আন্দাজে তা না বলার জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা বনি ইসরাইলে তিনি বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত বিশ্বাস নেই আন্দাজে তা প্রচার করো না। কেননা চোখ, কান ও অন্তর এ সমস্তরই জবাবদিহিতা করতে হবে।’

অপরদিকে গুজব হলো যার কোন ভিত্তি নেই। মিথ্যা খবর অপপ্রচার করে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মিথ্যা তো তারাই বানায় যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যাবাদী’ (সূরা নাহল, আয়াত-১০৫)।
তিনি আরও বলেন ‘মিথ্যাবাদীদের উপর অভিসম্পাত।’ (আল-ইমরান-৬১)
অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা মিথ্যুক অপচয়ীকে সুপথ দেখান না।’ (মুমিন : ২৮) আল্লাহ তায়া’লার লা’নত বা অভিশাপের চেয়ে বড় বিষয় আর কি হতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লা্ল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়’ (মুসলিম)।

দেশের বিভিন্ন জেলায় গুজব ছড়িয়েছে ” কুরআন শরীফে চুল পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো ধুয়ে পানি খেলে নাকি প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে,ইত্যাদি।

আশ্চর্য! কুরআন শরীফে পাওয়া চুল ধুয়ে পানি খেলে করোনা ভাইরাস হবেনা এই মহৌষধ কে বলে দিলো? এই মহান বার্তা কার কাছে আসলো, কে দিলো? কুরআন শরীফে থাকা চুল ধুয়ে পানি খেলে যদি করোনাভাইরাস থেকে বাঁচা যায়, তাহলে যুক্তি আর আকল তো বলে চুল ধুয়ে পানি না খেয়ে কুরআন শরীফ ধুয়ে পানি খেতে হবে। কারণ,চুলগুলো কুরআন শরীফে থাকার কারণে যদি সেগুলো এতই বরকতময় মহৌষধ হয়ে যায়, তাহলে যেই কুরআন শরীফে এই চুলগুলো পাওয়া গেলো সেই কুরআন শরীফ তারচে লক্ষ কোটিগুণ বেশি বরকতময় নয় কি!

এখন পর্যন্ত যারা চুল ধুয়ে পানি খেয়েছে তাদের কেহ কি চুলগুলো যেই কুরআন শরীফে পেয়েছে সেই কুরআন শরীফ ধুয়ে পানি খেয়েছে? নাহ,কেহ-ই খায়নি। এসব যে গুজব তা বুঝার জন্য বিবেক,সামান্য জ্ঞানই যথেষ্ট।

যে কুরআন শরীফ নিয়মিত তিলাওয়াত করা হয় বা মাঝেমধ্যে তিলাওয়াত করা হয় তাতে চুল পাওয়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়। কুরআন তিলাওয়াতের সময় মাথা থেকে অথবা চোখের ভ্র বা পাতির চুল পড়তেই পারে। এটা স্বাভাবিক। নতুন কুরআন শরীফ লাইব্রেরী থেকে কিনে আনলে চুল পাওয়া যাবেনা। যেই কুরআন শরীফ মানুষ কখনো পড়েনি সেই কুরআন শরীফে তো চুল থাকার প্রশ্নই আসে না। কুরআন শরীফে চুল পাওয়ার এ গুজব আজ নতুন নয়; আজ থেকে ৮-১০ বছর আগেও একবার রটেছিলে।

মিথ্যা, গুজব থেকে বেঁচে থাকুন। চুল ধুয়ে পানি খেলে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচা যাবে এমনটা বিশ্বাস করলে শিরিকের গুনাহ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এখানে গাইরুল্লাহকে রোগ থেকে মুক্তি দানকারী বিশ্বাস করা হলো। অথচ একমাত্র আল্লাহ তায়া’লা-ই মানুষকে রোগ থেকে মুক্তি দান করেন। পবিত্র কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে- যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই আমাকে পথপ্রদর্শন করেন। যিনি আমাকে আহার এবং পানীয় দান করেন। আমি যখন রোগাক্রান্ত হই,তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন।
(সুরা-শুয়ারা, আয়াত-৭৮-৮১)

করোনা ভাইরাস থেকে আত্মরক্ষার আমল!

করোনা ভাইরাস জাতীয় অন্যান্য মহামারী ও দূরারোগ্য ব্যাধি মূলত আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে গজব ও শাস্তি। মানুষ যখন ব্যাপক হারে আল্লাহ তা’আলার অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তা’আলা মানুষদের সতর্ক করার জন্য পৃথিবীতে বিভিন্ন গজব ও শাস্তি নাজিল করেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪০১৯)

এজন্য যেকোন মহামারি থেকে বাঁচতে সর্বপ্রথম করণীয় হচ্ছে— নিজেদের কৃতকর্ম থেকে তাওবা করা এবং বেশি বেশি ইস্তেগফার করা আর আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের দিকে ফিরে আসা।

পাশাপাশি যেখানে এ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাবে, সেখানে যাতায়াত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস : ১০৬৫)

এছাড়া নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহামারি থেকে বাঁচতে বেশি বেশি এই দুআ পড়তে বলেছেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ، وَالْجُنُونِ، وَالْجُذَامِ، وَمِنْ سَيِّئِ الأَسْقَامِ. (رَوَاهُ أَبو داود بإِسنادٍ صحيح)

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুযামি,ওয়া সাইয়ি ইল আসক্কাম’।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেত, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সমস্ত দুরারোগ্য ব্যাধি হতে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৫৫৪)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার তাওফিক দান করুন!

insaf24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *