৪০ কেজি পেঁয়াজ বেচে এক লিটার সয়াবিন কিনছেন চাষিরা

৪০ কেজি পেঁয়াজ বেচে এক লিটার সয়াবিন কিনছেন চাষিরা
গত সপ্তাহে হাটে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ১৫শ থেকে ১৬শ টাকা মণ।

কিছুটা লাভের আশা করেছিলেন চাষিরা। কিন্তু চাষির সেই আশার গুড়ে বালি পড়েছে। কারণ এক সপ্তাহর ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম প্রতি মণে গড়ে ৫শ টাকা কমে গেছে।

শনিবার (১৪) দেশের সর্ববৃহৎ পেঁয়াজের হাট বনগ্রামে সবচেয়ে ভালো মানের প্রতিমণ পেঁয়াজ এক হাজার থেকে সাড়ে ১১শ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

আর ফাটা পেঁয়াজ প্রতিমণ দু’শো টাকা দরেও বিক্রি হচ্ছে। এতে চাষিরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বলে তারা জানিয়েছেন।

তারা জানিয়েছেন, একমণ ফাটা পেঁয়াজ বিক্রি করে এক লিটার সয়াবিন তেলের দামও হচ্ছে না। চাষিরা পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

সরেজমিনে বনগ্রাম হাটে গিয়ে দেখা গেছে, হাটভর্তি পেঁয়াজ। হাটে জায়গা না পেয়ে অনেক চাষি রাস্তার ওপরও পেঁয়াজের বস্তা রেখেছেন।

পেঁয়াজ আমদানির অনুপাতে বাজারে চাহিদা নেই। ব্যাপারিরা বেশি পেঁয়াজ কিনতে উৎসাহী নন। ব্যাপারিদের ডেকে ডেকে এনে চাষিরা পেঁয়াজ বিক্রি করছেন।

বেশ কিছু পেঁয়াজচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দু’বছর পেঁয়াজ চাষিরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত বাজারে ভালো দাম পেয়ে লাভবান হয়েছেন।

এবার নিরাপদেই পেঁয়াজ ঘরে তুলতে পেরেছেন চাষিরা। তবে পেঁয়াজ মৌসুমে কয়েক দফায় ভারি বর্ষণ হওয়ায় পেঁয়াজ গাছ ফুলে ভরে গিয়েছিল।

এতে অধিকাংশ জমির পেঁয়াজ ফেটে গেছে। ফাটা পেঁয়াজের দাম কম আবার তা ঘরেও রাখা যায় না। শনিবার হাটে এরকম ফাটা পেঁয়াজ দু’শো টাকা মণ দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

চরপাড়া গ্রামের বারেক সর্দার বলেন, তিনি ফাটা পেঁয়াজ বাজারে এনে বিপাকে পড়েছেন। সকাল ৬টায় হাটে এসে বেলা ১১টা পর্যন্ত পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারেননি।

সুজানগর উপজেলার বামনদি গ্রামের পেঁয়াজচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের যে বাজার তাতে মণপ্রতি ৫শ-৬শ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এর ওপর যদি আবার পেঁয়াজ আমদানি করা হয় তাহলে চাষিরা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তিনি জানান, উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়েছে তাতে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১৫শ টাকা থেকে ১৬শ টাকা হলে চাষির কিছুটা লাভ থাকত।

পেঁয়াজ ব্যাপারী রেজাউল করিম জানান, তিনি বনগ্রাম, আতাইকুলা, কাশীনাথপুর, চিনাখড়া প্রভৃতি হাট থেকে পেঁয়াজ কিনে কারোয়ান বাজার, নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ করেন।

তিনি জানান, মাত্র ৩ দিনের ব্যবধানেই পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। তাই ব্যাপারিরা পেঁয়াজ বেশি দামে কিনতে পারছেন না।

আতাইকুলা থানার গোসাইপাড়া গ্রামের হেলাল উদ্দিন জানান, যে পেঁয়াজ চারদিন আগে বিক্রি করেছেন ১৫শ টাক প্রতিমণ, সেই পেঁয়াজ এখন দাম বলছে এক হাজার ৫০ টাকা মণ।

চাষিরা জানান, এবার পেঁয়াজ লাগানোর পর থেকেই অসময়ে কয়েকবার বৃষ্টি হয়। সে সময় অনেক জমিতে পানিও জমে গিয়েছিল। এর ফলে এবার পেঁয়াজ গাছ ফুল দিয়ে ভরে গেছে। ফলে উৎপাদন অনেক কমে গেছে। যে জমিতে বিঘায় ৬০-৭০ মণ ফলন হতো সেখানে এবার হয়েছে ৪০-৫০ মণ।

চাষিরা জানান, এবার প্রতি বিঘা পেঁয়াজের জমি বার্ষিক লিজ নিতে হয়েছে ১৫-২০ হাজার টাকা দিয়ে। এতে চাষিদের বিঘা প্রতি উৎপাদন খরচ পড়েছে ৪০-৪৫ হাজার টাকা। এক বিঘায় পেঁয়াজের গড় ফলন হয় ৪০-৫০ মণ। সে হিসাবে নয়শ থেকে এক হাজার টাকা মণে পেঁয়াজ বেচলে তাদের উৎপাদন খরচ উঠছে না।

কৃষি তথ্য সার্ভিস পাবনার আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কুমার সরকার জানান, পাবনা জেলায় এবার ৫৩ হাজার ৩০৫ পাঁচ হেক্টর জমিতে হালি (চারা) পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। চাষের লক্ষ্যমাত্র ছাড়িয়ে গেছে। এবার পাবনা থেকে অন্তত সাত লাখ ৪৯ হাজার ৩৪ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হবে বলে কৃষি বিভাগ আশাবাদী।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, দেশে প্রতিবছর পেঁয়াজের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। পাবনা জেলা থেকেই উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ থেকে সাত লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। যা মোট উৎপাদনের এক চতুর্থাংশের বেশি। আর পাবনা জেলার সাঁথিয়া-সুজানগর উপজেলা থেকে উৎপাদন হয় প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন। সে হিসাবে সারা দেশে মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের এক পঞ্চমাংশ উৎপাদিত হয় পাবনার এ দুটি উপজেলা থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *